বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল আবারো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শেষ শিরোপা জয়ের স্মৃতি এখন প্রায় ইতিহাসের অংশ। ২০০২ সালে রোনালদো নাজারিওর নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয়ের পর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৪ বছর। এই সময়ে একের পর এক হতাশা, ব্যর্থতা এবং হৃদয়ভাঙার গল্প জমেছে সেলেসাওদের ইতিহাসে।
এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু শিরোপা জয় নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা। নতুন প্রজন্মের তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ঘিরেই এখন কোটি কোটি ব্রাজিলিয়ানের স্বপ্ন।

দুই দশকের হতাশার ইতিহাস
২০০২ সালের পর ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযান বারবার থেমে গেছে নকআউট পর্বে। ২০০৬ সালে ফ্রান্স, ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডস, ২০১৪ সালে জার্মানি, ২০১৮ সালে বেলজিয়াম এবং ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে বিদায় নিতে হয়েছে দলটিকে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ৭-১ গোলের বিধ্বংসী পরাজয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। নিজ দেশে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে লাখো সমর্থকের সামনে এমন ভরাডুবি এখনো জাতীয় স্মৃতিতে গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।

বর্তমান প্রজন্মের অনেক ব্রাজিলিয়ান কখনো নিজেদের দেশকে বিশ্বকাপ জিততে দেখেনি। তারা শুনেছে ১৯৯৪ সালে রোমারিওর নেতৃত্বে শিরোপা জয়ের গল্প, ২০০২ সালে রোনালদোর বীরত্বের কাহিনি কিংবা ১৯৭০ সালে পেলের ঐতিহাসিক দলের আধিপত্যের কথা।
আশাবাদ কেন এত কম?
ব্রাজিলিয়ান জরিপ সংস্থা ডাটাফোলহার সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৯ শতাংশ ব্রাজিলিয়ান বিশ্বাস করেন যে তাদের দল বিশ্বকাপ জিততে পারবে। ১৯৯৪ সাল থেকে জরিপ শুরু হওয়ার পর এটি সর্বনিম্ন হার। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ৪৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডিও পেরোতে পারবে না।
এই হতাশার পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের নানা বিতর্ক ও দুর্বল পারফরম্যান্স। ২০২৫ সালে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) সভাপতি এদনালদো রদ্রিগেসকে নির্বাচন-সংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগে আদালতের নির্দেশে অপসারণ করা হয়। একই সময়ে জাতীয় দল ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব পার করছিল।
দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে ব্রাজিল ১৮ ম্যাচে মাত্র ২৮ পয়েন্ট নিয়ে পঞ্চম স্থানে শেষ করে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা তাদের চেয়ে ১০ পয়েন্ট বেশি নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করে।
বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনার কাছে ৪-১ গোলের লজ্জাজনক পরাজয় ছিল অন্যতম বড় ধাক্কা। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মারকিনিওস প্রকাশ্যে সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

আনচেলত্তির আগমন
এই ব্যর্থতার পর কোচ দোরিভাল জুনিয়রের বিদায় ত্বরান্বিত হয় এবং দায়িত্ব পান ইতালিয়ান কিংবদন্তি কোচ কার্লো আনচেলত্তি। রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক সফল এই কোচের ওপর এখন বিশাল প্রত্যাশা। ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটানোই তার প্রধান লক্ষ্য।
তবে সামনে রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইউরোপীয় দলগুলোর বিপক্ষে ব্রাজিলের সাম্প্রতিক রেকর্ড হতাশাজনক। গত পাঁচ বিশ্বকাপে ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়া ব্রাজিলকে বিদায়ের স্বাদ দিয়েছে।
১৯৭০-এর উত্তরাধিকার
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিলের নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে ১৯৭০ সালের সেই কিংবদন্তি দলকে। পেলের নেতৃত্বে মেক্সিকো বিশ্বকাপে যে নান্দনিক ফুটবল উপহার দিয়েছিল ব্রাজিল, তা আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, সেই দলের উত্তরাধিকারই আজকের ব্রাজিলের জন্য আশীর্বাদ এবং একই সঙ্গে অভিশাপ। কারণ ব্রাজিলকে শুধু জিতলেই হয় না, জিততে হয় সুন্দর ফুটবল খেলেও।
১৯৮২ সালের ব্রাজিল দল বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও তাদের আক্রমণাত্মক ও দৃষ্টিনন্দন ফুটবল এখনও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সৌন্দর্যও যেন হারিয়ে গেছে।

ভিনিসিয়ুসের কাঁধে স্বপ্ন
এবারের ব্রাজিল দলের সবচেয়ে বড় ভরসা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা ইতোমধ্যে দুইবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন, ব্যালন ডি'অর দৌড়ে রানার্সআপ হয়েছেন এবং ২০২৪ সালে ফিফা বর্ষসেরা পুরুষ ফুটবলারের পুরস্কার জিতেছেন।
ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কাফুর মতে, "এটি ভিনিসিয়ুসের বিশ্বকাপ। এবার তাকেই দলের নেতৃত্ব দিতে হবে।"
চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন নেইমার। এবার সেই দায়িত্ব অনেকটাই ভিনিসিয়ুসের কাঁধে।
২৫ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ড অবশ্য চাপকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তার ভাষায়, "আমি এখন দলের নেতৃত্ব দিচ্ছি এবং ব্রাজিলকে আবার বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ফিরিয়ে নিতে চাই।"

নেইমারের শেষ সুযোগ?
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে নেইমারের বিশ্বকাপ দলে অন্তর্ভুক্তি।
৩৪ বছর বয়সি এই তারকা ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর আর জাতীয় দলের হয়ে খেলেননি। দীর্ঘ সময় চোটে ভুগেছেন। তবুও আনচেলত্তি তাকে ২৬ সদস্যের দলে জায়গা দিয়েছেন।
ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সামনে এটি হয়তো শেষ বিশ্বকাপ। ২০১৪ সালের সেই দুঃস্বপ্নের দিনে চোটের কারণে মাঠে থাকতে পারেননি তিনি। বারো বছর পর আবারও বিশ্বকাপ মঞ্চে ফিরে নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাচ্ছেন।
ব্রাজিল কিংবদন্তি রোনালদোর মতে, "নেইমারকে আলাদা করে মূল্যায়নের দরকার নেই। সে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এবং তার সামর্থ্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।"
ষষ্ঠ তারকার অপেক্ষা
ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাস গৌরবময়। কিন্তু সেই ইতিহাসই আজ নতুন প্রজন্মের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। কারণ এই দেশের কাছে সাফল্যের সংজ্ঞা শুধু ভালো খেলা নয়, বিশ্বকাপ জয়।
সমর্থকদের আশা, ভিনিসিয়ুস, নেইমার, মারকিনিওস এবং আনচেলত্তির নেতৃত্বে এবার হয়তো শেষ হবে ২৪ বছরের অপেক্ষা।
বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারো কি জ্বলবে ব্রাজিলের ষষ্ঠ তারকা?
উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়ে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে ব্রাজিলের জন্য এটি শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া গৌরব পুনরুদ্ধারের যুদ্ধ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









