একদিকে জরাজীর্ণ সেতু, অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা নতুন সেতুর অসমাপ্ত কাঠামো। মাঝখানে কীর্তিনাশা নদী। নদীর দুই পাড়ের মানুষের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি কাজ। উল্টো গত দুই বছর ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো সেতুর ওপর দিয়েই প্রতিদিন চলাচল করতে হচ্ছে হাজারো মানুষ ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহনকে।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার প্রেমতলা ও জাজিরা উপজেলার কাজিরহাট এলাকায় কীর্তিনাশা নদীর ওপর নির্মিত পুরোনো সেতু দুটি দীর্ঘদিন ধরে চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সেতু দুটির পাশে নতুন দুটি সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বরেই কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে প্রায় চার বছর অতিবাহিত হলেও সেতু দুটি এখনো পুরোপুরি চালু করা যায়নি।
এদিকে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে উঠেছে এই সড়ক। প্রতিদিন এ পথে প্রায় ২০ হাজার মানুষের যাতায়াত। সেতু দুটি সরু হওয়ায় বিশেষ করে কাজিরহাট এলাকায় নিয়মিত যানজট তৈরি হচ্ছে। যাত্রাপথে বাড়তি সময় ব্যয়, ভোগান্তি এবং পুরোনো সেতুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।
সরু সেতুতে আটকে থাকে যানবাহন
শরীয়তপুর জেলা শহর থেকে জাজিরা উপজেলার নাওডোবা পর্যন্ত আঞ্চলিক সড়কটির দৈর্ঘ্য ২৭ কিলোমিটার। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সড়কটি দুই লেনের চেয়েও সরু। পদ্মা সেতু চালুর আগে এই পথ ব্যবহার করে জাজিরা প্রান্তের ঘাটে পৌঁছে ফেরিতে পদ্মা নদী পার হয়ে ঢাকায় যাতায়াত করতেন মানুষ। পদ্মা সেতু চালুর পর সড়কটিতে যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই সড়কের প্রেমতলা ও কাজিরহাট এলাকায় থাকা পুরোনো সেতু দুটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯৯১ সালে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্মিত সেতু দুটির মধ্যে প্রেমতলা সেতুর দৈর্ঘ্য ১১০ মিটার এবং কাজিরহাট সেতুর দৈর্ঘ্য ৫০ মিটার। দুটির প্রস্থই মাত্র ৩ মিটার।
দীর্ঘ ৩৫ বছর ব্যবহারের ফলে সেতু দুটির বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও সেতুর মেঝে, কোথাও রেলিং থেকে বেরিয়ে আছে লোহার রড। একসঙ্গে বিপরীতমুখী দুটি যানবাহন চলাচলের পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় একটি যানবাহন সেতুতে উঠলে অন্য দিকের যানবাহনকে অপেক্ষা করতে হয়। এতে বিশেষ করে কাজিরহাট এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়।
সওজের তথ্য অনুযায়ী, সড়ক ও সেতু দুটি দিয়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০টি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। এর মধ্যে যাত্রীবাহী বাসের সংখ্যা আড়াই শতাধিক। এত বিপুলসংখ্যক যানবাহনের চাপ সামলাতে গিয়ে পুরোনো সেতু দুটি এখন গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের অন্যতম প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেড় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লাগছে দুই ঘণ্টা
সড়কটির যানজটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে যাত্রীদের যাতায়াতে। বিশেষ করে কাজিরহাট এলাকায় সেতু পার হতে গিয়ে বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ঢাকা-শরীয়তপুর পথে চলাচলকারী শরীয়তপুর সুপার সার্ভিসের চালক লোকমান হোসেন বলেন, প্রতিদিন তাঁকে যাত্রী নিয়ে ঢাকায় যেতে হয়, আবার ঢাকা থেকে শরীয়তপুরে ফিরতে হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে শরীয়তপুর থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী যেতে প্রায় দেড় ঘণ্টা লাগার কথা। কিন্তু কাজিরহাট এলাকায় যানজটে আটকে থাকায় প্রায় দুই ঘণ্টা লেগে যায়। সেখানে কখনো কখনো ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে যাত্রীরা বিরক্ত হন।
গোসাইরহাট উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী আমির হোসেন সপ্তাহে দুই দিন ব্যবসার কাজে ঢাকায় যান। গত শুক্রবার ঢাকায় যাওয়ার পথে তাঁর বাসও কাজিরহাট বাজার এলাকায় যানজটে আটকা পড়ে।
আমির হোসেন বলেন, ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে বাসে উঠলে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটে জাজিরার নাওডোবায় পৌঁছানো যায়। কিন্তু কাজিরহাটের পুরোনো সেতু এলাকায় যানজটে আটকে অতিরিক্ত ২৫ থেকে ৩০ মিনিট ব্যয় হয়। তবে প্রেমতলা সেতু এলাকায় সাধারণত যানজট হয় না।
যাত্রীদের অভিযোগ, সেতু দুটি সময়মতো নির্মাণ শেষ করা গেলে একদিকে যেমন যানজট কমত, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো সেতুর ওপর নির্ভরশীলতাও কমে আসত।
৫৮ কোটি টাকার প্রকল্পে অগ্রগতি থমকে আছে
শরীয়তপুর থেকে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের নাওডোবা পর্যন্ত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে ২০২০ সালে ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। প্রকল্পের আওতায় প্রেমতলা ও কাজিরহাটে নতুন দুটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রেমতলায় ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ দশমিক ৩ মিটার প্রস্থের এবং কাজিরহাটে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ দশমিক ৩ মিটার প্রস্থের সেতু নির্মাণের কথা। সেতু দুটির জন্য বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয় ৫৮ কোটি টাকা।
২০২১ সালের ১ এপ্রিল জামিল ইকবাল লিমিটেড ও মোজাহারুল এন্টারপ্রাইজকে যৌথভাবে নির্মাণকাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। পরবর্তী সময়ে তিন দফায় সময় বাড়ানো হলেও নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা যায়নি। চতুর্থ দফায় সময় বাড়ানোর আবেদনও করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, কাজিরহাট সেতুর প্রায় ৬০ শতাংশ এবং প্রেমতলা সেতুর প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এরপর গত দুই বছর ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে।
গত বুধবার সরেজমিনে প্রেমতলা ও কাজিরহাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কাজিরহাট সেতুর নির্মাণকাজ অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। নদীর মধ্যে সেতুর কিছু অংশ নির্মাণ করা হলেও বাকি অংশের কাজ এগোয়নি। সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মী নির্মাণসামগ্রী পাহারা দিচ্ছেন।
অন্যদিকে প্রেমতলা সেতুর মূল কাঠামোর অধিকাংশ কাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক, রেলিং ও বিভিন্ন সেবা-সংযোগের কাজ বাকি রয়েছে। ফলে সেতু দুটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। কিছু ভারী যানবাহন ঝুঁকি এড়াতে মাঝেমধ্যে প্রেমতলার নতুন সেতু ব্যবহার করে পার হলেও অধিকাংশ যানবাহনকে পুরোনো সেতুর ওপর দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।
ভূমি অধিগ্রহণ থেকে ব্যয় বৃদ্ধি, নানা কারণের কথা ঠিকাদারের
নির্মাণকাজ বিলম্বিত হওয়ার কারণ হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, অতিরিক্ত কাজ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা জানিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, ৫৮ কোটি টাকার চুক্তিমূল্যের বাইরে আরও ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ পর্যন্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৪৪ কোটি ৮২ লাখ টাকার বিল তুলে নিয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাবে সওজের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেলেও মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা রয়েছে।
সেতু দুটির নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী কিংশুক মণ্ডল বলেন, করোনাকালে কাজটি পাওয়ার পর নির্মাণকাজ শুরু করতে কিছুটা দেরি হয়। এরপর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
কিংশুক মণ্ডল আরও বলেন, সেতু দুটিতে কিছু অতিরিক্ত কাজ করতে হয়েছে। এ ছাড়া কয়েক দফায় নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। এসব কারণে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সওজের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে বাকি কাজ শেষ করে সেতু দুটি সওজের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
দ্রুত কাজ শেষ করার আশ্বাস সওজের
সেতু দুটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সওজের শরীয়তপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মনোয়ারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব ঢাকায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দ্রুততম সময়ে সেতু দুটির নির্মাণকাজ শেষ করে যানবাহন চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা চলছে।
তবে কবে নাগাদ নির্মাণকাজ শেষ হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে চলাচলকারী যাত্রী ও পরিবহনচালকদের দুর্ভোগের অবসান কবে হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
উন্নয়নের সুফল পেতে অপেক্ষা আর কত?
পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানীর সঙ্গে শরীয়তপুরের সড়ক যোগাযোগ সহজ হয়েছে। বেড়েছে যানবাহন চলাচল ও আঞ্চলিক সড়কটির গুরুত্ব। কিন্তু সেই যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি সেতুর নির্মাণকাজ বছরের পর বছর অসমাপ্ত থাকায় উন্নত যোগাযোগের সুফল পুরোপুরি পাচ্ছেন না যাত্রীরা।
নতুন সেতু দুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল পুরোনো সেতুর ঝুঁকি কমাতে এবং যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে। অথচ কাজ শেষ না হওয়ায় পুরোনো সেতুর ওপর নির্ভরশীলতা রয়ে গেছে। একদিকে সেতুর জরাজীর্ণ অবস্থা, অন্যদিকে যানজটে নষ্ট হচ্ছে যাত্রীদের মূল্যবান সময়।
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া চললেও মাঠপর্যায়ে নির্মাণকাজ কবে শুরু হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতার দায় শেষ পর্যন্ত বহন করবেন কারা? আর প্রতিদিন ঝুঁকি ও ভোগান্তি নিয়ে চলাচল করা মানুষকে স্বস্তি দিতে সেতু দুটি চালু হবে কবে?
স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট দপ্তর দ্রুত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্মাণকাজ শুরু ও শেষ করবে। কারণ, তাঁদের কাছে সেতু দুটি কেবল অবকাঠামো নয়; নিরাপদ যাতায়াত, সময় সাশ্রয় এবং রাজধানীর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









